সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জলাভূমি ধ্বংসের পরিণাম

 বাংলাদেশে শুধু নদী নয়, অসংখ্য খালবিল, নালা, পুকুর-ডোবা রয়েছে। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি দিন দিন কমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কমছে জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী। রামসার কনভেনশন অনুযায়ী জলাভূমি বলতে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট, স্থায়ী বা অস্থায়ী, স্থির বা প্রবহমান পানিরাশিবিশিষ্ট স্বাদু, লবণাক্ত বা মিশ্র পানি এলাকা বোঝায়। বন্যপ্রাণী বলতে বোঝায় বিভিন্ন প্রকার ও জাতের প্রাণী, যার আবাসস্থল জীবনচক্রের কোনো এক পর্যায়ে বনে। 

Revolut- your first money transfer

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জলাভূমি গত ৫০ বছরে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। ১৯৭১ সালে জলাভূমির পরিমাণ ছিল ৯৩ লাখ হেক্টর। তা কমে এখন হয়েছে ২৮ লাখ হেক্টর। অর্থাৎ ৬৫ লাখ হেক্টর জলাভূমি কমেছে। বিশ্বের দিকে তাকালেও এমন চিত্র চোখে পড়বে। বিশ্বের মোট জলাভূমির প্রায় ৯০ শতাংশ বিলুপ্ত হয়েছে। বাকি জলাশয়গুলোও হুমকির মুখে। এসব জলাভূমি মোট প্রাণী প্রজাতির ৪০ শতাংশের আশ্রয়স্থল। প্রতিনিয়ত এসব জায়গা থেকে নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের বড় সংখ্যক প্রাণী প্রজাতি জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৬৪ প্রজাতির উভচর তো বটেই, ৮৩ প্রজাতির সৈকত পাখি, ৩০ প্রজাতির বুনোহাঁস, আট প্রজাতির শামুকখোল, ১৮ প্রজাতির বগলাসহ অসংখ্য প্রজাতি এর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। এ ছাড়া প্রতি বছর শীতের সময় বিপুলসংখ্যক পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশে আসে, যাদের আবাসস্থল ও খাবার দুটোই জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। 
জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, নদী-জলাশয়-লেক-জলাভূমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ, জলাশয়ে পয়ঃপ্রণালি স্থাপন, বিভিন্ন তরল ও কঠিন বর্জ্য নির্গমন, বালু-পাথর আহরণ ইত্যাদি। এ ছাড়া ঝিনুক, কোরাল, মাছ, কচ্ছপ প্রভৃতি ধরা-মারাও জলাশয়ের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। 

Ali express imagine and buy

২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী তপশিল-১ মতে ২৫ প্রজাতি এবং তপশিল-২ মতে ৫২ প্রজাতির মাছ সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। এই ৫২ প্রজাতির মাছ ধরা, মারা, বিক্রয়, বিপণন করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব মাছ বন্যপ্রাণী হিসেবে গণ্য হবে। মাছগুলো হলো– পাখনামাথা হাতুড়ি হাঙর, দক্ষিণি হাতুড়ি হাঙর, মসৃণ হাতুড়ি হাঙর, হাঙর, বাদামিদাগি বাঁশ হাঙর, মুইচিয়া হাঙর, কানি হাঙর, তিমি হাঙর, থুটটি হাঙর, কালা হাঙর, রেশমি হাঙর, চওড়ামুখি হাঙর, থুটা হাঙর, দাগিলেজ হাঙর, বাঘা হাঙর, গাঙ্গেয় হাঙর, ফৌরি হাঙর, চোখানাসা পীতম্বরী, দানব পীতম্বরী, সবুজ করাতি হাঙর, লম্বাদন্তী করাতি হাঙর, ছুরিদন্তী করাতি হাঙর, দেশি বড় বাইন ও পাতি সমুদ্র ঘোড়া, তিলাশোল, পাখনা মহাশোল, সোনালি মহাশোল, ভাঙন মাছ, নানদিনা, ঘোড়ামুইখা, দানব বাঘাইড়, চেনুয়া, কোঠা কুমিরের খিল, তেলোটাকি, তারা বাইন, নাপিত কৈ, নাফতানি, কুঁচিয়া, রিঠা, দেশি বোল, জয়া হিরালু, বাংলা রানী, তিলা বিশতারা, গাঙ মাগুর ধাইন, লম্বালেজি পদ্মমামনি, বেনেটের হাউশপাতা, নীলচিত্রা হাউশপাতা, চিত্রা শঙ্খচিল, দাগি শঙ্খচিল, কাঁটালেজি দেওমাছ। 

Sliminmax-pl Be slim. 

এসব মাছ সচরাচর দেখা যায় না। এখনই সচেতন না হলে অচিরেই আমরা এসব প্রজাতির মাছ হারিয়ে ফেলব। সরকার এসব মাছ ধরা-মারা-বিক্রয় নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। আমাদের এখন কড়া নজর দিতে হবে জলাশয় যাতে  ভরাট করা না হয়। জলাভূমি নিয়ে সরকারের আইন থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। জলাশয়ের ওপর শুধু মাছ নয়, বিভিন্ন শামুক-কচ্ছপসহ অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি নির্ভরশীল। জলাভূমি রক্ষা করতে না পারলে শুধু প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হবে না; ধ্বংস হয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট বাস্তুতন্ত্র। 


ড. বিভূতিভূষণ মিত্র: শিক্ষক ও গবেষক 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ০১ জুন ২০২৪, ০৭:৪১ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ সারা বিশ্বেই বনের আশপাশের স্থানীয় জনগণ বনকে যেমন ব্যবহার করে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণও করে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ বনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সামাজিক বনায়ন একটি বিকল্প বন ব্যবস্থাপনা। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ বনে বাস করে এবং একই সঙ্গে বনকে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এর মাধ্যমে তাদের অধিকার ও স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বন রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য যেমন দূর করা হয়, তেমনি স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন করা হয়। এটি খুব সহজেই কম খরচের মাধ্যমে করা যায়। বাংলাদেশ বন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে ২.১৬ মিলিয়ন বন রয়েছে, যা প্রায় ১৪ শতাংশ। অনেকের তথ্যমতে, অনেক জেলায় বনের তথ্য নেই। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালে বন হ্রাসের হার ছিল ২.১ শতাংশ, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালে এটি কমে হয়েছে ০.২ শতাংশ। তারপরও বন হ্রাসের বৈশ্বিক হার (০.১ শতাংশ) থেকে বেশি। বন হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দা...

আইন অমান্যের পরও নেই প্রতিবিধান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  আইন অমান্যের পরও নেই প্রতিবিধান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৪ ১০:৫১ এএম  ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বন্য প্রাণী পাচার বলতে সংরক্ষিত উদ্ভিদ প্রাণী প্রজাতির অবৈধ ব্যবসা বোঝায়। এ অবৈধ ব্যবসা অনেক কিছু নিয়েই হতে পারে। এটা খাবার, চামড়া, কাঠ পাচারও হতে পারে। অনেক বন্য প্রাণী পাচার হয় যা হয়তো বিপদসংকুল প্রজাতি নয়। কিন্তু বন্য প্রাণী পাচারের কারণেই অনেক এলাকা এখন বিপদসংকুল। অপ্রতুল জীববৈচিত্র্য আর বন্য প্রাণী পাচারের কারণে লাতিন আমেরিকা এখন বিপদসংকুল। ব্রাজিলের একটি সংস্থার মতে, প্রতি বছর ১২ মিলিয়ন বন্য প্রাণী পাচার হয় সে দেশে। পৃথিবীর অধিকাংশ বন হারিয়ে গেছে কাঠের জন্য কৃষিবন করে। এ ছাড়া প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৫১ থেকে ১৫২ বিলিয়ন ডলার অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কারণে ধ্বংস হচ্ছে। অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে অনেক দেশের বন হারিয়ে যেতে বসেছে। গত ২৫ বছরে ঘানায় ৮০ ভাগ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০১১ সালের তুলনায় কম্বোডিয়ায় প্রায় ৬৪ ভাগ বন নেই হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে ৬০ ভাগের বেশি বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে অবৈধ বন্য প্রাণী ব্যবসার কারণে। প্রতি বছর ১০...

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...