সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা



হাতি সংরক্ষণ

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

ড. বিভূতিভূষণ মিত্র


প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম



ড. বিভূতিভূষণ মিত্র


বাংলাদেশে বসবাসরত হাতির নাম এশিয়ান এলিফ্যান্ট। এ হাতি খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিশ্বের ১৩ দেশে এর বিচরণ। আইইউসিএনের মতে বাংলাদেশে তিন ধরনের হাতি রয়েছে। এগুলো হলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসরত হাতি, পরিব্রাজনকারী হাতি ও পোষ মানা হাতি। বন্য প্রাণীবিদদের মতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। একটি তথ্যমতে বাংলাদেশে আবাসস্থলে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিব্রাজনকারী হাতি ৯৩ আর পোষ মানা হাতি ৯৬টি। ২০১৯ সালের একটি তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল সে সময় ২৬৩টি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জরিপমতে বাংলাদেশে বর্তমান হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি দেখা যায় বেশি। মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বটা বেশি দেখা যায় সেখানেই। তবে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়ও হাতি দেখা যায়। বন বিভাগের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ১৭ বছরে ১১৮টি হাতি হত্যা করা হয়।

আইইউসিএনের ২০২১ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে ৯০টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর শ্রীলঙ্কায় ২০০ হাতি হত্যার কবলে পড়ে। ভারতে মানুষ-হাতি সংঘর্ষে মারা পড়ে বছরে ১০০ হাতি। কেনিয়ায়ও এ সংখ্যা বছরে ১২০-এর বেশি। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী আইন অনুযায়ী হাতি হত্যাকারীকে দুই থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সর্বনিম্ন অর্থদণ্ড দেওয়া হয় ১ থেকে ১০ লাখ টাকা। আত্মরক্ষার্থে এ আইন প্রযোজ্য নয়। বিজ্ঞানীদের মতে বাংলাদেশে হাতি চলাচলে মোট ১২টি জায়গা আছে। হাতি চলাচলের এসব জায়গা দিনদিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। হাতির খাদ্যগ্রহণ, প্রজননের জন্য এসব জায়গা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাতি চলাচলের এসব জায়গা স্বাভাবিক করা যেমন দরকার, তেমন দরকার হাতির পছন্দের গাছ লাগানো। এতে হাতি আর বাসাবাড়ির দিকে আসবে না খাবার না পেয়ে।


তা ছাড়া যেসব মানুষ বনাঞ্চলে বসবাস করে তারা হতদরিদ্র হওয়ায় হাতির সঙ্গে তাদের এক প্রকার প্রতিযোগিতা হয়। এতে মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব মানুষকে ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এনে জীবনযাত্রার মান বাড়ানো যেতে পারে। বন্য প্রাণী হাতির সঙ্গে মানুষের প্রতিযোগিতা হয় মূলত জমি, খাদ্য, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে। হাতির সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হাতির বিচরণ ক্ষেত্রগুলোয় মানুষ বসতবাড়ি বানাচ্ছে। হাতি বসবাসের এলাকায় গড়ে উঠছে নতুন নতুন গ্রাম। এ ছাড়া খামার, শহর, বড় রাস্তা, শিল্পকারখানাও গড়ে উঠছে। হাতির যাতায়াতের পথে মানুষ বেড়া দিচ্ছে। হাতিরা মূলত তৃণভোজী। এরা দিনে ১৫০ কিলোগ্রাম ঘাস ও ১৯০ লিটার পানি পান করে। এজন্যই তাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়াতে হয়। একটি বড় পুরুষ হাতির ওজন ৬ হাজার ৮০০ কিলোগ্রাম, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের থেকে শতগুণ ভারী।

ভারতে ১৯৯২ সালে ‘হস্তী প্রকল্প’ চালু করা হয়েছিল। এ প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হাতির সংখ্যা, আবাসস্থল ও স্থানান্তরের পথ রক্ষা করা। হাতির বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করার পাশাপাশি হাতি সংরক্ষণ ব্যবস্থপনা গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া। এ ছাড়া স্থানীয় জনগণের মধ্যে হাতি সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও এর উদ্দেশ্য ছিল। যেসব হাতি বন্দি সেসব হাতি যেন উন্নত চিকিৎসা পায় তা-ও লক্ষ্য ছিল। দেশে সম্প্রতি হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পবিষয়ক একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাতি সংরক্ষণের নানা উদ্যোগের কথা উঠে আসে। সম্প্রতি পরিবেশ উপদেষ্টা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনেন। যেমন উপদেষ্টা হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল উন্নয়নের কথা বলেন। এ ছাড়া নিরাপদ প্রজনন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, হাতির সংখ্যা নিরূপণ ও গবেষণা, মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর বিভাগের যে কটি জেলায় হাতি দেখা যায়, সেসব জেলায় এসব কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানান উপদেষ্টা। কিছু গাছ আছে যেগুলো হাতির খাদ্য হিসেবে উপযোগী, সেসব গাছ লাগানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। এ ছাড়া জলাধার খনন, হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন, বায়োফেন্সিং নির্মাণ এসব উদ্যোগের কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসন ও বন এলাকার হতদরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। কৃষিজমির ক্ষতি হয়ে মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এটি যেমন দেখতে হবে, তেমন সেখানকার মানুষও যেন হাতিকে শত্রু মনে না করে, হাতির চলাচল যেন বাধাগ্রস্ত না করে সেদিকেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। হাতিকে হাতির বিচরণ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক চলাফেরা আর পর্যাপ্ত খাদ্য-পানি রাখা হলে হাতিকেও আর লোকালয়ে আসতে হবে না। এতে এ দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

হাতি মনিটরিংয়ের জন্য ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে হাতির দল কোথায় কখন যাচ্ছে তা জেনে সহজেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। লোকালয়ে হাতি এলে পটকাবাজি ও সাইরেনের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে বনের ভেতর তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হাতি যেসব কারণে লোকালয়ে চলে আসে বিশেষ করে খাবার জল, বনের ভেতরে সেজন্য অনেক ঘাস লাগানো ও ডোবা খনন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আরও একটি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। হাতির সম্ভাব্য লোকালয়ে প্রবেশের রাস্তায় এক ধরনের যন্ত্র স্থাপন করা যেতে পারে। এ যন্ত্রটি হাতিকে দেখামাত্র সাইরেন বাজাবে। এতে হাতিরা ভয়ে বনের ভেতরে ঢুকে যাবে। এ ছাড়া স্থানীয়দের সঙ্গে রেডিও নেটওয়ার্ক স্থাপন, বনকর্মীদের মোটরসাইকেলের মাধ্যমে স্মার্ট প্যাট্রলিং এসব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

শিক্ষক ও গবেষক

https://protidinerbangladesh.com/opinion/119019/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%9C%E0%A6%A8-%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BF-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%A8%E0%A6%BE


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...

বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৯ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম পর্যটন শিল্প। এটি এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। কেননা একই সঙ্গে পৃথিবীতে যেমন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নও সাধিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৫ মিলিয়ন, তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৬ লাখ ৬০ হাজারে। আর ২০১৭ সালেই জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ১০.৪ ভাগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এমন অবদান দেখানো যাবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। পর্যটকদের সংখ্যাও অনেক ছিল। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। আর দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা যোগ করলে এর সংখ্যা প্রায় চার কোটির কাছাকাছি চলে যাবে। এর ফলে এ খাতে বিনিয়োগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে অনেক। ২০১৭ সালের হিসাবমতে, পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২৪ লাখ ৩২ হাজার আর বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩...