সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 


পরিবেশ

সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র


প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম


ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র


বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে।

এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন।



২০২০ সালের এক গবেষণার তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৮০ সালে যেখানে কোরাল প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৪১, তা ২০১৮ সালে নেমে হয়েছে ৪০টিতে। আগে দ্বীপটিতে কোরাল ছিল ১.৩২ বর্গকিলোমিটার জুড়ে। এখন এটি কমে ০.৩৯ বর্গ কিলোমিটার হয়েছে। আগে দ্বীপটিতে গাছ ছিল ৪.৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। এখন তা কমে ৩ বর্গ কিলোমিটার হয়েছে। এখানকার জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির মুখে। বিভিন্ন প্রজাতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। এর মধ্যে প্রবাল, সামুদ্রিক শৈবাল, কাছিম, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ অনেক কিছুই রয়েছে এ বিলুপ্তির তালিকায়।



 

২০২২ সালে বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সেন্টমার্টিন প্রটেকটেড এরিয়া ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনের ৫৯০ হেক্টর এলাকাকে ঘোষণা করা হয় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে। সেন্টমার্টিনে ৬৫ প্রজাতির প্রবাল থাকার কথা। কিন্তু ২০১৬ সালে মাত্র ৪১ প্রজাতির প্রবাল দেখা যায়। এমনকি গত দশক থেকে দ্বীপটির নারকেল ও কেওড়া গাছ বিলুপ্তির পথে।

দিনদিন এ দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। এ দ্বীপ টিকিয়ে রাখার জন্য ১৯৯৫ সালেই কিছু নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সেটি ২০১০ সালে সংশোধনও করা হয়। তার পরও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেই চলেছে। মূলত প্রতিদিনই এখানে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত থাকে। এসব অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশ দূষণ করেই চলেছে। পর্যটকদের অসচেতনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে দ্বীপটি বাঁচানোই এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

দ্বীপটিতে নানান কর্মকাণ্ড জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং আবহাওয়া পরিবর্তন। এসব জীববৈচিত্র্যের ওপর তীব্র ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে। ২০২৩ সালে সেন্টমার্টিনে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ ভ্রমণ করে। এ সংখ্যাই বলে দিচ্ছে কী পরিমাণ প্রভাব প্রতিদিন সেন্টমার্টিনকে সইতে হয়। সেন্টমার্টিনে প্রবাল উত্তোলন, কেনাবেচা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। তার পরও এগুলো কেনাবেচা হচ্ছে। এখানকার কাছিম ধরা, মারা, ডিম সংগ্রহ ও বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে। রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো ও হইচই করতেও বারণ করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলা নিষেধ করা হয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৈকতে, সমুদ্রে এবং নাফ নদে। এ ছাড়া মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে সাইকেল, ভ্যানও চালানো নিষেধ। দ্বীপের চারপাশে নৌভ্রমণ, জোয়ারভাটা এলাকায় পাথরের ওপর হাঁটা, ফ্ল্যাশলাইট ব্যবহার করে ছবি তোলা, রাতের বেলা আগুন জ্বালানো, আতশবাজি, ফানুস ওড়ানো, সামুদ্রিক ঘাস ও কেয়াফল সংগ্রহ নিষেধ থাকলেও এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। সেন্টমার্টিনে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করার কথা বলা আছে। তা সত্ত্বেও এখানে গড়ে উঠেছে নানা রকমের স্থাপনা। গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল ও মোটেল। পর্যটকদের চাপ বেশি থাকায় সুপেয় পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। এখানে এখন নলকূপ দিয়ে সুপেয় পানি বেরোচ্ছে না। বেরোচ্ছে লবণাক্ত পানি। পর্যটকরা এসে যেখানে সেখানে প্লাস্টিকের নানান বর্জ্য ফেলে রাখে। এটিও দূষণের অন্যতম কারণ। এখানে স্পষ্ট বলা আছেÑ সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৈকতে, সমুদ্রে এবং নাফ নদে কোনোরকমের প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলা যাবে না।

সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার হ্রাসসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সরকার হোটেল কর্মী, পরিবহন কর্মীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের দিকে এগোচ্ছে। এখানে যুবসমাজকে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কথা ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণের সমস্যা, বর্জ্য উৎপাদন হ্রাস ইত্যাদি বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার শূন্য বর্জ্য ধারণা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে সেন্টমার্টিন দ্বীপে।

এ ছাড়া সম্প্রতি সেন্টমার্টিনে বসবাসরত মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা ভাবছে সরকার। বিকল্প কর্মসংস্থান নির্ধারণে একটি টিমও গঠন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সভায় স্থানীয়দের কী কী বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে তার একটি তালিকা করা হয়। সভায় জানানো হয়, মাছ ধরার আধুনিক জাল সরবরাহ, শুঁটকি মাছের বাজারজাতকরণ, মাশরুম ও সবজি চাষ, পোল্ট্রি ও গবাদি পশু পালন, সেলাই, নকশিকাঁথা, নারকেল ছোবড়া দিয়ে দড়ি তৈরি প্রভৃতি দ্বারা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একটি অঞ্চলের স্থানীয়দের কর্মসংস্থান সংস্কৃতি জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলে। স্থানীয়দের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যবান্ধব বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য নতুন রূপে ফিরে আসবে।

শিক্ষক ও গবেষক 


https://protidinerbangladesh.com/opinion/136359/%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%A8



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আইন অমান্যের পরও নেই প্রতিবিধান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  আইন অমান্যের পরও নেই প্রতিবিধান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৪ ১০:৫১ এএম  ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বন্য প্রাণী পাচার বলতে সংরক্ষিত উদ্ভিদ প্রাণী প্রজাতির অবৈধ ব্যবসা বোঝায়। এ অবৈধ ব্যবসা অনেক কিছু নিয়েই হতে পারে। এটা খাবার, চামড়া, কাঠ পাচারও হতে পারে। অনেক বন্য প্রাণী পাচার হয় যা হয়তো বিপদসংকুল প্রজাতি নয়। কিন্তু বন্য প্রাণী পাচারের কারণেই অনেক এলাকা এখন বিপদসংকুল। অপ্রতুল জীববৈচিত্র্য আর বন্য প্রাণী পাচারের কারণে লাতিন আমেরিকা এখন বিপদসংকুল। ব্রাজিলের একটি সংস্থার মতে, প্রতি বছর ১২ মিলিয়ন বন্য প্রাণী পাচার হয় সে দেশে। পৃথিবীর অধিকাংশ বন হারিয়ে গেছে কাঠের জন্য কৃষিবন করে। এ ছাড়া প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৫১ থেকে ১৫২ বিলিয়ন ডলার অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কারণে ধ্বংস হচ্ছে। অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে অনেক দেশের বন হারিয়ে যেতে বসেছে। গত ২৫ বছরে ঘানায় ৮০ ভাগ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০১১ সালের তুলনায় কম্বোডিয়ায় প্রায় ৬৪ ভাগ বন নেই হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে ৬০ ভাগের বেশি বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে অবৈধ বন্য প্রাণী ব্যবসার কারণে। প্রতি বছর ১০...

প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ০১ জুন ২০২৪, ০৭:৪১ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ সারা বিশ্বেই বনের আশপাশের স্থানীয় জনগণ বনকে যেমন ব্যবহার করে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণও করে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ বনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সামাজিক বনায়ন একটি বিকল্প বন ব্যবস্থাপনা। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ বনে বাস করে এবং একই সঙ্গে বনকে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এর মাধ্যমে তাদের অধিকার ও স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বন রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য যেমন দূর করা হয়, তেমনি স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন করা হয়। এটি খুব সহজেই কম খরচের মাধ্যমে করা যায়। বাংলাদেশ বন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে ২.১৬ মিলিয়ন বন রয়েছে, যা প্রায় ১৪ শতাংশ। অনেকের তথ্যমতে, অনেক জেলায় বনের তথ্য নেই। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালে বন হ্রাসের হার ছিল ২.১ শতাংশ, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালে এটি কমে হয়েছে ০.২ শতাংশ। তারপরও বন হ্রাসের বৈশ্বিক হার (০.১ শতাংশ) থেকে বেশি। বন হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দা...