সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গাছ কাটা কেন বন্ধ হয় না ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র




 গাছ কাটা কেন বন্ধ হয় না

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

০৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘গাছ কেটো না’ শিরোনামে একটি কবিতা আছে। এর প্রথম কয়েকটি লাইন এমন-

কাল যে ছিল গাছের সারি/ আজ পড়েছে কাটা, / রাস্তা দিয়ে তাই তো ভারী/ শক্ত হলো হাঁটা। / রোদ্দুরে গা যাচ্ছে পুড়ে/ এখন রাস্তাঘাটে/ বাইরে গেলেই ভরদুপুরে/ এখন চাঁদি ফাটে।

সনাতন ধর্মে তো বেশ কিছু গাছের সরাসরি পূজা করা হয়। যেমন - তুলসী, অশ্বত্থ, বেল, নিম, বট, আমলকী। তুলসীগাছকে এরা শুভ ও মঙ্গলসূচক মনে করে। এখানে তুলসীকে লক্ষ্মীর রূপ মনে করা হয়। অশ্বত্থগাছে ত্রিদেব দেবতা বাস করেন বলে এর রোপণ ও রক্ষা করলে ধনদৌলত, স্বর্গ ইত্যাদি লাভ হয় বলে মনে করা হয়। নিমগাছে নেতিবাচক শক্তির বিনাশ ঘটে বলে এটি বাসা বা অফিসে লাগিয়ে রাখা হয়। বটকে পবিত্র বৃক্ষ মনে করেন সনাতনীরা। এটি মানুষের দীর্ঘায়ু দান করে বলেও মনে করেন তারা।

বৃক্ষদেবতা আর নেই। সত্যি গাছ নেই। যে বৃক্ষের বুকে মুখ বুজে মানুষের জন্ম-মৃত্যু-বেঁচে থাকা, সেই বৃক্ষই এখন আর নেই। চারপাশে শুধু কংক্রিট। চারপাশে শুধু ইট-পাথরের দেয়াল। পত্রিকার পৃষ্ঠা ওল্টালেই প্রায় দেখা যায় গাছ কাটার মহোৎসব, অমুক জায়গায় কেটে ফেলা হলো গাছ, রাতের আঁধারে কাটা হলো গাছÑ এমন ধরনের খবর। এটা কোনো নির্দিষ্ট দিন বা মাসে নয়। এই খবর সারা বছরই চোখে পড়ে। কিন্তু কেন আমরা সহজেই কেটে ফেলছি গাছ। গাছ কেটে ফেলাটা এত সহজ কেন? এর কি কোনো আইন নেই? আসলেই বৃক্ষ হত্যার কোনো আইন নেই আমাদের দেশে। এগুলোই মূল কারণ। অবাধে গাছ কাটার অন্যতম কারণ গাছ কাটা নিয়ে নির্দিষ্ট আইন না থাকা। ফলত দোষী ব্যক্তিরা সাজা পাচ্ছেন না। এসব সুযোগে গাছ কাটায় উৎসাহিত হচ্ছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ গাছ কাটা নিয়ে আদতে বাংলাদেশে তেমন কোনো মামলা নেই। যে মামলা আছে তা রিট মামলা। এ গাছ কাটা অপরাধ সংক্রান্ত মামলা চোখে পড়ে না। গাছের যেহেতু ব্যবহার আছে, মানুষ গাছ তো কাটবেই। কিন্তু এই কাটাটার মধ্যেও রয়েসয়ে কাটার একটা ব্যাপার আছে। কিছু রীতিনীতি আছে।

এ অঞ্চলে প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্রাবিড় সভ্যতার বিকাশের সময় বনের ব্যবহার সম্পর্কে জানা গেছে। সে সময় তারা গাছ কেটে ঘর বানাত। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বেদ, পুরাণ, রামায়ণ ও মহাভারতেও বন ও বনায়ন সম্পর্কে জানা যায়। এসব গ্রন্থে শাল, বেল, কিংশুক প্রভৃতির কথা উল্লেখ আছে। সম্রাট অশোক সম্পর্কে জানা যায়, তিনি বন ও বন্যপ্রাণী ভালোবাসতেন ও সেসবের খুব যত্ন নিতেন এবং বন সংরক্ষণ করতেন। মোগলদের আমলে বন সংরক্ষণের কথা তেমন পাওয়া না গেলেও তাদের বন ব্যবহার করার কথা জানা গেছে। তারা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বনের গাছ ব্যবহার করত। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যাপক মাত্রায় বন কেটে রেললাইনসহ নানা কাজ শুরু করলেও ভারতবর্ষে প্রথম বন সংরক্ষণের কথা আসে লর্ড ডালহৌসির আমলে। পরে ১৮৬৪ সালের ১ নভেম্বর প্রথম ভারতে বন বিভাগ চালু হয়।

যদিও অনেক জায়গায় গাছ কাটা নিয়ে বেশ কিছু আইন আছে। যেমন ইউপি ট্রি সংরক্ষণ আইন বলে একটি আইন আছে। এটি সংশোধিত হয় ২০১৭ সালে। এই আইন অনুযায়ী নিম, আম, মহুয়া, পিয়াল ইত্যাদি গাছ কাটার আগে অনুমতি নিতে হয়। এই আইনে এও বলা আছে, যদি একটি বড় গাছ কাটা হয় তবে একটি বড় গাছ কাটার জন্য ১০টি ছোট গাছ লাগাতে হবে। ১০টি ছোট গাছ লাগাতে যদি জমি কম পড়ে সে ক্ষেত্রে বাকি জমি বন বিভাগকে দিতে বলা হয়েছে। ১৯২৭ সালের ভারতীয় বন আইন অনুযায়ী প্রতিটি রাজ্যে গাছ কাটা বন্ধে বিধিনিষেধ রাখার কথা বলা হয়েছে। এখানেও গাছ কাটার জন্য অনুমতি এবং অনুমতি ছাড়া গাছ কাটলে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দানের কথা বলা আছে। ২০০৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বন অচল সংরক্ষণ আইনেও গাছ কাটা বন্ধে বলা হয়েছে বন অঞ্চলে কোনো গাছ কাটা যাবে না। তবে আগাছা জাতীয় গাছ কেটে ফেলতে বা অপসারণ করতে পারবেন। এখানেও বেআইনিভাবে গাছ কাটলে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১৯৭১ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রের গাছ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বেআইনি গাছ কাটার শাস্তি ১ হাজার থেকে ৫ হাজার এবং ১ সপ্তাহ থেকে ১ বছরের কারাদণ্ড।

বাংলাদেশেও বন আইন আছে। এখানে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া আছে। জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশ ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল ২০১২ সংসদে উত্থাপন করা হয়। এতে বন ও সড়কের পাশে গাছ কাটলে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধার রাখা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বনের গাছ আহরণ বন্ধ রাখা হয়েছে ১৯৮৯ সাল থেকে। এই বিলে বলা আছে, সরকার গাছ কাটার অনুমতি দিলে প্রতি একটি গাছের বিপরীতে তিনটি গাছ লাগাতে হবে। এমনকি বন বা সরকারি স্থানের কোনো গাছ মরে গেলে বা শুকিয়ে গেলেও এটি কাটা যাবে না। বন্যপ্রাণী ও আবাসস্থল হিসেবে তা সংরক্ষণ করতে হবে।

একটি দেশের ২৫ ভাগ বন থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে আছে ৮ শতাংশের মতো। তাই এই মুহূর্তে বৃক্ষ কর্তনসংক্রান্ত যথাযথ আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র : শিক্ষক ও গবেষক


https://www.dainikamadershomoy.com/details/018fe99a90393

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ড. বিভূতিভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম ড. বিভূতিভূষণ মিত্র বাংলাদেশে বসবাসরত হাতির নাম এশিয়ান এলিফ্যান্ট। এ হাতি খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিশ্বের ১৩ দেশে এর বিচরণ। আইইউসিএনের মতে বাংলাদেশে তিন ধরনের হাতি রয়েছে। এগুলো হলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসরত হাতি, পরিব্রাজনকারী হাতি ও পোষ মানা হাতি। বন্য প্রাণীবিদদের মতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। একটি তথ্যমতে বাংলাদেশে আবাসস্থলে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিব্রাজনকারী হাতি ৯৩ আর পোষ মানা হাতি ৯৬টি। ২০১৯ সালের একটি তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল সে সময় ২৬৩টি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জরিপমতে বাংলাদেশে বর্তমান হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি দেখা যায় বেশি। মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বটা বেশি দেখা যায় সেখানেই। তবে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়ও হাতি দেখা যায়। বন বিভাগের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ১৭ বছরে ১১৮টি হাতি হত্যা করা হয়। আইইউসিএনের ২০২১ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে ৯০টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর শ্রীলঙ...

বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৯ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম পর্যটন শিল্প। এটি এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। কেননা একই সঙ্গে পৃথিবীতে যেমন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নও সাধিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৫ মিলিয়ন, তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৬ লাখ ৬০ হাজারে। আর ২০১৭ সালেই জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ১০.৪ ভাগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এমন অবদান দেখানো যাবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। পর্যটকদের সংখ্যাও অনেক ছিল। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। আর দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা যোগ করলে এর সংখ্যা প্রায় চার কোটির কাছাকাছি চলে যাবে। এর ফলে এ খাতে বিনিয়োগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে অনেক। ২০১৭ সালের হিসাবমতে, পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২৪ লাখ ৩২ হাজার আর বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩...