সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রোহিঙ্গা সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়

 রোহিঙ্গা সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে একটি উদার ও মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছে। মানুষের পাশে অবশ্যই মানুষের দাঁড়ানো উচিত। সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।


বাংলাদেশে ২০১৭ সালের আগস্টের মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে এর সংখ্যা আনুমানিক ১১ লাখ। সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য ৬ হাজার একর বনভূমি বরাদ্দ দিয়েছে। বাংলাদেশের বনভূমি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর বিরাট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে ২০১৮ সালে একটি কাজ করেছিল। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী কক্সবাজার এলাকায় তখন প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছিল। এ সময় প্রায় ৪৩০০ একর পাহাড় ও বনাঞ্চল কেটে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। প্রতিবেদন মতে, এখানকার ১৫০২ হেক্টর বন এখন সংকুচিত হয়ে ৭৯৩ হেক্টরে নেমেছে। টেকনাফ-উখিয়া-হিমছড়ির প্রায় ৩০০০ থেকে ৪০০০ একর পাহাড়ি এলাকা বাগানের জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে। যে হারে জ্বালানি কাঠ কাটা হচ্ছে তাতে ২৫ হাজার একর বনভূমি বছরে উজাড় হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ১ মাসে ৬৮০০ টন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করা হয় এবং প্রতিদিন প্রতিটা রোহিঙ্গা পরিবার ৬০টি বাঁশ ব্যবহার করে। কয়েক হাজার টিউবওয়েল সেখানে স্থাপন করা হয়েছে, যা জলের স্তরের ওপর প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বায়ুদূষণ বেড়েছে। বনের ক্ষয়ের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছাড়া অন্যান্য জায়গার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে বন ও বনের জীবজন্তুর ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে। অনুমান করা হচ্ছে দিনে সেখানে ৩ থেকে ৫টি ফুটবল খেলার মাঠের সমান বন ধ্বংস হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ সেঙ্কচুয়ারি, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান ও ইনানি সংরক্ষিত বনও এর থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এখানে প্রতিদিন কাঠ কাটা থেকে শুরু করে বনের নানা সম্পদ তারা ধ্বংস করছে। টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ সেঙ্কচুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে হাতির সংখ্যা বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আছে। এ অবস্থায় হাতি ছাড়াও এখানকার অন্য প্রাণীরা বিপদসংকুল হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া কুতুপালং ক্যাম্পে বন্য হাতির তা-বে ১১ জনের মৃত্যু ও অসংখ্য হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কুতুপালং ক্যাম্পটি প্রাচীনকাল থেকেই পরিব্রাজক পথ হিসেবে হাতি ব্যবহার করে আসছে। সেই পথে এখন হাতির যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা নানা পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে ক্যাম্পে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ করা হলে জ্বালানি হিসেবে গাছ কাটার প্রবণতা কমবে। রোহিঙ্গা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্যের বিষয়টিও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র : গবেষক ও কলাম লেখক
bhushan.bibhutimitra@gmail.com

https://www.kholakagojbd.com/prints/35751 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আইন অমান্যের পরও নেই প্রতিবিধান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  আইন অমান্যের পরও নেই প্রতিবিধান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৪ ১০:৫১ এএম  ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বন্য প্রাণী পাচার বলতে সংরক্ষিত উদ্ভিদ প্রাণী প্রজাতির অবৈধ ব্যবসা বোঝায়। এ অবৈধ ব্যবসা অনেক কিছু নিয়েই হতে পারে। এটা খাবার, চামড়া, কাঠ পাচারও হতে পারে। অনেক বন্য প্রাণী পাচার হয় যা হয়তো বিপদসংকুল প্রজাতি নয়। কিন্তু বন্য প্রাণী পাচারের কারণেই অনেক এলাকা এখন বিপদসংকুল। অপ্রতুল জীববৈচিত্র্য আর বন্য প্রাণী পাচারের কারণে লাতিন আমেরিকা এখন বিপদসংকুল। ব্রাজিলের একটি সংস্থার মতে, প্রতি বছর ১২ মিলিয়ন বন্য প্রাণী পাচার হয় সে দেশে। পৃথিবীর অধিকাংশ বন হারিয়ে গেছে কাঠের জন্য কৃষিবন করে। এ ছাড়া প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৫১ থেকে ১৫২ বিলিয়ন ডলার অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কারণে ধ্বংস হচ্ছে। অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে অনেক দেশের বন হারিয়ে যেতে বসেছে। গত ২৫ বছরে ঘানায় ৮০ ভাগ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০১১ সালের তুলনায় কম্বোডিয়ায় প্রায় ৬৪ ভাগ বন নেই হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে ৬০ ভাগের বেশি বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে অবৈধ বন্য প্রাণী ব্যবসার কারণে। প্রতি বছর ১০...

প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ০১ জুন ২০২৪, ০৭:৪১ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ সারা বিশ্বেই বনের আশপাশের স্থানীয় জনগণ বনকে যেমন ব্যবহার করে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণও করে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ বনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সামাজিক বনায়ন একটি বিকল্প বন ব্যবস্থাপনা। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ বনে বাস করে এবং একই সঙ্গে বনকে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এর মাধ্যমে তাদের অধিকার ও স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বন রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য যেমন দূর করা হয়, তেমনি স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন করা হয়। এটি খুব সহজেই কম খরচের মাধ্যমে করা যায়। বাংলাদেশ বন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে ২.১৬ মিলিয়ন বন রয়েছে, যা প্রায় ১৪ শতাংশ। অনেকের তথ্যমতে, অনেক জেলায় বনের তথ্য নেই। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালে বন হ্রাসের হার ছিল ২.১ শতাংশ, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালে এটি কমে হয়েছে ০.২ শতাংশ। তারপরও বন হ্রাসের বৈশ্বিক হার (০.১ শতাংশ) থেকে বেশি। বন হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দা...

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...