সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সেন্ট মার্টিনের সুরক্ষা জরুরি ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 



সেন্ট মার্টিনের সুরক্ষা জরুরি

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র


বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপের নাম সেন্ট মার্টিন। এটি কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে। এর স্থানীয় নাম নারিকেল জিঞ্জিরা। সেন্ট মার্টিনের ডাব অত্যন্ত সুস্বাদু।

এখানে কোরাল, সুন্দরী পোয়া, ইলিশ, রূপচাঁদা, কালাচাঁদা প্রভৃতি পাওয়া যায়। এখানে স্বচ্ছ পানিতে যেমন জেলিফিশ দেখা যায়, তেমনি নারকেলগাছের দীর্ঘ সারি মানুষকে আকৃষ্ট করে সহজেই।

একটি তথ্য মতে, এখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। বলা হয়ে থাকে, আনুমানিক ৩০০ বছর ধরে এখানে মানুষ বসবাস করছে।

দিন দিন এই দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করলেও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেই চলেছে। মূলত প্রতিদিনই এখানে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত থাকে, যা পরিবেশদূষণ করেই চলেছে। পর্যটকদের অসচেতনতা ও দায়িত্ব জ্ঞানহীন আচরণের কারণে জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে দ্বীপটি বাঁচানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। প্রবাল, সামুদ্রিক শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ অনেক কিছুই বিলুপ্তির সম্মুখীন।

সেন্ট মার্টিনে প্রবাল উত্তোলন, কেনাবেচা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এ ছাড়া এখানকার কাছিম ধরা, মারা, ডিম সংগ্রহ করা ও বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সামুদ্রিক কাছিম শীতকালে সেন্ট মার্টিন সৈকতে ডিম পাড়ে।

রাতে সৈকতে আলো না জ্বালাতে বলা হয়। এ ছাড়া হৈচৈ করতেও নিষেধ করা হয়।

আমরা সৈকতে হাঁটার সময়ও কোথাও খেয়াল না করেই হাঁটি। কিন্তু এভাবে হাঁটা মোটেও ঠিক নয়। কেননা কাঁকড়াদের বাসা থাকে। খেয়াল না করে হাঁটলে বাসা ভেঙে যেতে পারে। যেসব জিনিস পচে না সেসব জিনিস যেমন প্লাস্টিক, কাচ ফেলা ঠিক নয়।

সেন্ট মার্টিনে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে গড়ে উঠেছে নানা রকমের স্থাপনা। গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল ও মোটেল। পর্য়টকদের চাপ বেশি থাকায় সুপেয় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এমনকি নলকূপ দিয়েও এখন আর সুপেয় পানি বেরোচ্ছে না। বেরোচ্ছে লবণাক্ত পানি। পর্যটকরা যেখানে-সেখানে প্লাস্টিকের নানা বর্জ্য ফেলে রাখে।

এই দ্বীপকে টিকিয়ে রাখার জন্য ১৯৯৫ সালেই কিছু নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সেটি ২০১০ সালে সংশোধনও করা হয়। এখানে স্পষ্ট বলা আছে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সৈকতে, সমুদ্রে এবং নাফ নদে কোনো রকমের প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলা যাবে না। এ ছাড়া মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে সাইকেল, ভ্যানও চালানো নিষেধ করা হয়। দ্বীপের চারপাশে নৌভ্রমণ, জোয়ার-ভাটা এলাকায় পাথরের ওপর হাঁটা, ফ্ল্যাশ লাইট ব্যবহার করে ছবি তোলা, রাতের বেলা আগুন জ্বালানো, আতশবাজি, ফানুস ওড়ানো, সামুদ্রিক ঘাস, কেয়াফল সংগ্রহ প্রভৃতি নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবাদীরা এসব ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছেন যেন এখানে একেবারে বেশিসংখ্যক পর্যটক না প্রবেশ করে। যেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা করা হয়েছে তা যেন ভেঙে ফেলা হয়। যেহেতু সেন্ট মার্টিনের দূষণ মারাত্মক পর্যায়ের আর পর্যটকদের চাপ অত্যধিক বেশি, তাই এখানে কিছু সময়ের জন্য পর্যটক আসা বন্ধ করা গেলে জীববৈচিত্র্য আরো নতুন করে জেগে উঠবে বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা। সম্প্রতি পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা ও সুন্দরবনকে জরুরি ভিত্তিতে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আব্দুল হামিদ একটি সেমিনারে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক সীমিত করার কথাও বলেছেন। সত্যিকার অর্থে এসব উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া পূরণ হবে। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন হয়তো ফিরে পাবে তার আপন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

 

 লেখক: শিক্ষক ও গবেষক    

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ড. বিভূতিভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম ড. বিভূতিভূষণ মিত্র বাংলাদেশে বসবাসরত হাতির নাম এশিয়ান এলিফ্যান্ট। এ হাতি খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিশ্বের ১৩ দেশে এর বিচরণ। আইইউসিএনের মতে বাংলাদেশে তিন ধরনের হাতি রয়েছে। এগুলো হলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসরত হাতি, পরিব্রাজনকারী হাতি ও পোষ মানা হাতি। বন্য প্রাণীবিদদের মতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। একটি তথ্যমতে বাংলাদেশে আবাসস্থলে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিব্রাজনকারী হাতি ৯৩ আর পোষ মানা হাতি ৯৬টি। ২০১৯ সালের একটি তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল সে সময় ২৬৩টি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জরিপমতে বাংলাদেশে বর্তমান হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি দেখা যায় বেশি। মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বটা বেশি দেখা যায় সেখানেই। তবে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়ও হাতি দেখা যায়। বন বিভাগের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ১৭ বছরে ১১৮টি হাতি হত্যা করা হয়। আইইউসিএনের ২০২১ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে ৯০টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর শ্রীলঙ...

প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  প্রয়োজন পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ০১ জুন ২০২৪, ০৭:৪১ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ সারা বিশ্বেই বনের আশপাশের স্থানীয় জনগণ বনকে যেমন ব্যবহার করে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণও করে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ বনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সামাজিক বনায়ন একটি বিকল্প বন ব্যবস্থাপনা। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ বনে বাস করে এবং একই সঙ্গে বনকে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এর মাধ্যমে তাদের অধিকার ও স্থানীয় জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বন রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য যেমন দূর করা হয়, তেমনি স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন করা হয়। এটি খুব সহজেই কম খরচের মাধ্যমে করা যায়। বাংলাদেশ বন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে ২.১৬ মিলিয়ন বন রয়েছে, যা প্রায় ১৪ শতাংশ। অনেকের তথ্যমতে, অনেক জেলায় বনের তথ্য নেই। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালে বন হ্রাসের হার ছিল ২.১ শতাংশ, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালে এটি কমে হয়েছে ০.২ শতাংশ। তারপরও বন হ্রাসের বৈশ্বিক হার (০.১ শতাংশ) থেকে বেশি। বন হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দা...