সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শুশুকের অসুখ ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 




প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৪, ০৮:৪৪

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্রবেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের দৈনিকগুলোয় হালদা নদীতে ডলফিন মারা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে দুই প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। একটিকে গাঙ্গেজ ডলফিন বলা হয়, আরেকটি ইরাবতী ডলফিন। গাঙ্গেজ ডলফিনকেই শিশু বা শিশুক বা শুশুক বলা হয়। এটি মূলত মিঠাপানির ডলফিন। আর ইরাবতী ডলফিন সাগর বা সাগর নিকটবর্তী নদীতে পাওয়া যায়। হালদা নদীর ডলফিনকে শুশুক বলা হয়। এটি গাঙ্গেজ ডলফিন।

হালদা নদী বাংলাদেশের পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। এটি খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম জেলায় পড়েছে। এর দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১৩৪ মিটার। নদীটি দেখতে সর্পিলাকার। হালদা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র। এই নদীতে জোয়ার-ভাটা ঘটে। মিঠাপানির মাছ এই নদীতে ডিম ছাড়ে। হালদা পৃথিবীর একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখানে কার্পজাতীয় মাছ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ ডিম পাড়ে। সেই ডিম সংগ্রহ করা হয়। পৃথিবীর আর কোথাও এমন নদী নেই, যেখান থেকে মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়।

হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ডলফিন পাওয়া গেছে ১৬৭টি, ২০২০ সালে ১২৭টি। গাঙ্গেয় ডলফিন পৃথিবীর বিপন্ন প্রজাতির একটি। এর মধ্যে হালদায় রয়েছে ১৭০টি। এই ডলফিন গঙ্গা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণফুলীতে পাওয়া যায়। ভারত ও নেপালেও এটি দেখা যায়। শুশুকের মুখের চোয়াল সামনের দিকে বাড়ানো, প্রতি চোয়ালে ২৮ থেকে ২৯টি দাঁত থাকে। পুরুষ শুশুক থেকে বড় স্ত্রী শুশুক। স্ত্রী শুশুক গড়ে ২.৪ থেকে ২.৬ মিটার লম্বা। আর পুরুষ শুশুক গড়ে ২ থেকে ২.২ মিটার লম্বা। এরা কিন্তু ডিম পাড়ে না। সন্তান প্রসব করে এবং স্তন্যদান করে।

বাংলাদেশে শুশুককে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রাখা হয়েছে। একটি তথ্যমতে, এই প্রজাতির সংখ্যা সারা বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার। বাংলাদেশে বাস করে পৃথিবীতে বাস করা মোট প্রজাতির এক-তৃতীয়াংশ; অর্থাৎ সুন্দরবনে ২২৫, পদ্মা-যমুনায় ২০০, কর্ণফুলী, সাঙ্গু, সুরমা, হালদায় প্রায় ৫০০টি। ডলফিনকে পানির ওপরে সাঁতরাতে ও লাফাতে বেশি দেখা যায়। এরা ৩-৪ মিনিট পরপর পানির ওপরে উঠে শ্বাস নেয় আর ছাড়ে। এই ডলফিনের কিছু মজার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরা চোখে দেখতে পায় না। তীক্ষ্ণ শব্দ ছোড়ার মাধ্যমে শিকার খোঁজে। এদের ওজন ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। দুই-তিন বছরে একবার বাচ্চা দেয়। এর গড় আয়ু ২০ থেকে ২২ বছর।

এই শুশুক কিন্তু মানুষের বন্ধুও বটে। অনেক জেলে শুশুক দিয়ে মাছ শিকার করে। এমন বন্ধু শুশুককেও মানুষ নির্বিচারে হত্যা করে। অথচ শুশুক মানুষের কোনো ক্ষতিই করে না। এ ছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রায়ই মা ও বাচ্চা শুশুক মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। এর কারণ, শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে সার কারখানার অ্যামোনিয়া বর্জ্যের আধিক্য। একটি তথ্যমতে, ২০২২ সালে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতেই মৃত ডলফিন পাওয়া যায় ১৮টি। ২০২১ সালে পাওয়া যায় ২৪টি।

সুন্দরবনে ডলফিন রক্ষায় ৬টি অভয়ারণ্য রয়েছে। ডলফিন রক্ষায় সরকারেরও অ্যাকশন প্ল্যান রয়েছে। তা সত্ত্বেও এর মৃত্যু কিন্তু থেমে নেই। আইইউসিএনের বিপন্ন তালিকায় থাকা এই শুশুক রক্ষা করতে না পারলে একদিন এটি হয়তো হারিয়েই যাবে। তাই শুশুকের এই অসুখ আমাদের সারাতেই হবে। এ জন্য ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র—সব জায়গা থেকেই শুশুক রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ জরুরি। 

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র, শিক্ষক ও গবেষক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ড. বিভূতিভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম ড. বিভূতিভূষণ মিত্র বাংলাদেশে বসবাসরত হাতির নাম এশিয়ান এলিফ্যান্ট। এ হাতি খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিশ্বের ১৩ দেশে এর বিচরণ। আইইউসিএনের মতে বাংলাদেশে তিন ধরনের হাতি রয়েছে। এগুলো হলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসরত হাতি, পরিব্রাজনকারী হাতি ও পোষ মানা হাতি। বন্য প্রাণীবিদদের মতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। একটি তথ্যমতে বাংলাদেশে আবাসস্থলে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিব্রাজনকারী হাতি ৯৩ আর পোষ মানা হাতি ৯৬টি। ২০১৯ সালের একটি তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল সে সময় ২৬৩টি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জরিপমতে বাংলাদেশে বর্তমান হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি দেখা যায় বেশি। মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বটা বেশি দেখা যায় সেখানেই। তবে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়ও হাতি দেখা যায়। বন বিভাগের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ১৭ বছরে ১১৮টি হাতি হত্যা করা হয়। আইইউসিএনের ২০২১ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে ৯০টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর শ্রীলঙ...

বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৯ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম পর্যটন শিল্প। এটি এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। কেননা একই সঙ্গে পৃথিবীতে যেমন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নও সাধিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৫ মিলিয়ন, তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৬ লাখ ৬০ হাজারে। আর ২০১৭ সালেই জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ১০.৪ ভাগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এমন অবদান দেখানো যাবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। পর্যটকদের সংখ্যাও অনেক ছিল। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। আর দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা যোগ করলে এর সংখ্যা প্রায় চার কোটির কাছাকাছি চলে যাবে। এর ফলে এ খাতে বিনিয়োগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে অনেক। ২০১৭ সালের হিসাবমতে, পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২৪ লাখ ৩২ হাজার আর বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩...