সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুকুর খননও প্রয়োজন

 

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুকুর খননও প্রয়োজন

ড. বিভূতিভূষণ মিত্র

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৪, ০৭:৪৮

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে—এটা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছিল। নানাভাবে এর ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রভাব বোধকরি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবার ঢাকাসহ ৪৫টি জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি নিছক তাপপ্রবাহ নয়। তীব্র তাপপ্রবাহ। রেড অ্যালার্ট জারি করতে হয়েছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ করতে হয়েছে।



তিন দশকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা পাওয়া গেছে। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা সংক্ষেপে সিইজিআইএসের হিসাব মতে, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা প্রতিবছর গড়ে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রতিবছর শূন্য দশমিক ০০৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তথ্য তাপমাত্রা বৃদ্ধি সম্পর্কে ধারণা দিতে যথেষ্ট। প্রতিবছর এটি বেড়েই চলেছে।

১৯৯১ থেকে ২০০০—তাপমাত্রা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গড়ে বেড়েছে ১ দশমিক ০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ গাছপালা কাটার সঙ্গে সঙ্গে জলাধার ভরাটও।



২০১৮ সালে ঢাকায় ১০০টি পুকুর থাকলেও এটি এখন কমতে কমতে দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। ৫ বছরে পুকুর কমেছে ৭১টি। বিআইপির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩ হাজার ১৬২ একর জলাশয়ের মধ্যে ভরাট করা হয়েছে ২৭ শতাংশ। ফলে তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

মৎস্য বিভাগের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকায় ১২০টি সরকারি পুকুর, ৩২টি বেসরকারি পুকুর এবং ৩১টি লেক আছে। অথচ ১৯৮৫ 
সালে এই পুকুরের সংখ্যা ছিল ২ হাজার। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় ১৯২৪ সালে ১২০টি পুকুর ছিল। এখন আছে মাত্র ২৪টি, অর্থাৎ ৯৬টি পুকুরই ভরাট করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বা সংক্ষেপে বিআইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫৩ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে হয়েছে ২৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জলাভূমি ও জলাধার ছিল ৩০ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার। জলাভূমি ভরাট হতে হতে এখন তা হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার। জলাধার শুধু কমে যাওয়া নয়, এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে দিন দিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ জলাধার থাকা দরকার, কিন্তু বাস্তবে এখন তা ৪-৫ শতাংশের কম।



ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় ১৯৮৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি নাই হয়ে গেছে। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে জলাভূমির পরিমাণ ১০ ভাগেরও নিচে নেমে আসবে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে খালের সংখ্যা ৪৭টি। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের হিসাব মতে, ঢাকায় ৫৬টি খাল থাকার কথা থাকলেও সবগুলোই প্রায় মৃত। যদিও ২৬টি খাল উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।

রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চের তথ্যমতে, ঢাকায় ২৪১টি পুকুর কোনোরকমে টিকে আছে। পুরান ঢাকায় টিকে আছে ২৪টি। ২৪১টি পুকুর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আওতায় আছে। ফলে সেসব কেউ দখল করতে পারেনি। বাকি ৮৬টি পুকুরের ৭টি দখল করেছে সরকারি সংস্থা আর ৭৯টি দখল করেছে বেসরকারি সংস্থা। তাদের মতে, একটি শহরে ৫ শতাংশ জলাশয় থাকার প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

শুধু ঢাকা শহর নয়, সারা দেশের বিভিন্ন পৌর এলাকায়ও এখন একই চিত্র। যেমন ২০২৩ সালে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় দুই বছরে ২০টি পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। এসব পুকুর ভরাট করে অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে ভবন। এই চিত্র শুধু সাতক্ষীরা নয়, সার দেশেই পাওয়া যাবে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার পরিবর্তন, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। এই আইন ভঙ্গ করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। তারপরও মহা উৎসবের সঙ্গে এসব জলাধার মানুষ ভরাট করছে। যার শাস্তি শুধু আমরা নই, আমাদের নতুন প্রজন্মকেও ভোগ করতে হচ্ছে।



এভাবে একে একে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি বিষাক্ত দেশ। এখনো আমরা সতর্ক না হলে তাপমাত্রা আরও বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে মানুষের রোগ-মৃত্যুও। এভাবে চলতে থাকলে একসময়ের সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ হয়ে উঠবে রুক্ষ, শুষ্ক মরুভূমি। এ জন্য এই মুহূর্তে স্থানীয় জাতের গাছপালা রোপণ যেমন দরকার, তেমনি দরকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো দখলমুক্ত করা। ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুর-খাল খনন করা।

ড. বিভূতিভূষণ মিত্র, শিক্ষক ও গবেষক


https://www.ajkerpatrika.com/336270/%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B0-%E0%A6%96%E0%A6%A8%E0%A6%A8%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%9F%E0%A7%8B%E0%A6%9C%E0%A6%A8

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ড. বিভূতিভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম ড. বিভূতিভূষণ মিত্র বাংলাদেশে বসবাসরত হাতির নাম এশিয়ান এলিফ্যান্ট। এ হাতি খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিশ্বের ১৩ দেশে এর বিচরণ। আইইউসিএনের মতে বাংলাদেশে তিন ধরনের হাতি রয়েছে। এগুলো হলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসরত হাতি, পরিব্রাজনকারী হাতি ও পোষ মানা হাতি। বন্য প্রাণীবিদদের মতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। একটি তথ্যমতে বাংলাদেশে আবাসস্থলে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিব্রাজনকারী হাতি ৯৩ আর পোষ মানা হাতি ৯৬টি। ২০১৯ সালের একটি তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল সে সময় ২৬৩টি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জরিপমতে বাংলাদেশে বর্তমান হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি দেখা যায় বেশি। মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বটা বেশি দেখা যায় সেখানেই। তবে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়ও হাতি দেখা যায়। বন বিভাগের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ১৭ বছরে ১১৮টি হাতি হত্যা করা হয়। আইইউসিএনের ২০২১ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে ৯০টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর শ্রীলঙ...

বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৯ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম পর্যটন শিল্প। এটি এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। কেননা একই সঙ্গে পৃথিবীতে যেমন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নও সাধিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৫ মিলিয়ন, তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৬ লাখ ৬০ হাজারে। আর ২০১৭ সালেই জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ১০.৪ ভাগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এমন অবদান দেখানো যাবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। পর্যটকদের সংখ্যাও অনেক ছিল। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। আর দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা যোগ করলে এর সংখ্যা প্রায় চার কোটির কাছাকাছি চলে যাবে। এর ফলে এ খাতে বিনিয়োগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে অনেক। ২০১৭ সালের হিসাবমতে, পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২৪ লাখ ৩২ হাজার আর বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩...