সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পার্থেনিয়াম ক্ষতিকর গাছ

 


ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র শিক্ষক ও গবেষক

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৪৯

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্রপার্থেনিয়াম এক ধরনের আগাছা। এর উচ্চতা দুই থেকে তিন ফুট। এর আয়ুষ্কাল তিন থেকে চার মাস। এর পাতা চিকন। সবুজ রঙের। ফুল ছোট ছোট সাদা রঙের। এর অসংখ্য শাখা থাকে। ত্রিভুজের মতো ছড়ানো। এটি ১-১.৫ মিটার লম্বা হয়। গাছটি তিনবার ফুল ও বীজ দেয়। এই ফুল গোলাকার ও পিচ্ছিল। এটি অ্যাস্টারিসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একধরনের বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। দেখতে হাইব্রিড ধানগাছের মতো। এর পাতা গাজরের পাতার মতো। অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন কংগ্রেস ঘাস, গাজর ঘাস, চেতক চাঁদনী প্রভৃতি। 

এটি মূলত উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, মেক্সিকো ও ক্যারাবিয়ান অঞ্চলে দেখা যায়। এটি এখন ২০টির বেশি দেশে ছড়িয়েছে। বাংলাদেশে এটি নাকফুল নামেও পরিচিত। এটি আলো ও তাপের প্রতি অসংবেদনশীল। তবে খরা সহনশীল। 

সীমান্তসংলগ্ন বাংলাদেশের ৩৫টি জেলায় এর বিস্তার ঘটেছে বলে সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় উঠে এসেছে। এটি বেগুন, টমেটো, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের পরাগায়ন কমিয়ে দেয়। ধান, ছোলা, সরিষা, গমসহ বিভিন্ন ফসলের অঙ্কুরোদগমে ও বৃদ্ধিতে বাধা দিচ্ছে। এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত সভায় জানানো হয়, মানুষ বা গবাদিপশু পার্থেনিয়াম দ্বারা আক্রান্ত হয়। এর সংস্পর্শে চুলকানির সৃষ্টি হয়। ফলে শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমাসহ নানা রোগ দেখা দেয়।

গবাদিপশুর শরীরে লাগলে ফুলে যায়। এর ফলে তীব্র জ্বর হয়। বদহজমসহ নানা রকমের রোগ হয়। গবাদিপশু এই গাছ খেয়ে ফেললে জ্বর পর্যন্তও হতে পারে। মানুষের ত্বক লালচে হয় এবং ফুলে যায়। ত্বক ক্যানসারও হতে পারে। এর ফলে ঘন ঘন জ্বর, মাথাব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। একটি তথ্যমতে, ভারতের পুনেতে পার্থেনিয়ামজনিত বিষক্রিয়ায় ১২ জন মারা গেছে। 

আমের বাগান, আখ, কলা, হলুদখেতে এর আক্রমণ বেশি। করলা ও শিমখেতেও এদের আক্রমণ বেশি হতে দেখা যায়। বেগুন, টমেটো, মরিচ ইত্যাদি ফসলের পরাগায়ন হ্রাস করে এরা। এটি ফলন কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া উদ্ভিদের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে বাধাগ্রস্ত করে।

এই গাছ থেকে চার ধরনের টক্সিন বের হয়। এগুলো হলো পারথেনিন, হিস্টামিন, হাইমেনিন ও অবরোসিন। এই টক্সিন নানা রকমের অ্যাজমা, অ্যালার্জি, ডার্মাইটিস, ব্রঙ্কাইটিসের জন্য দায়ী। 

এই আগাছার প্রথম অস্তিত্ব দেখা যায় ২০০৮ সালে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিভ অ্যাডকিনস যশোর অঞ্চলে প্রথম এটি দেখতে পান। একটি পার্থেনিয়াম থেকে ৬০ হাজার গাছ হয়। এ বীজ বাতাসের সাহায্যে ছড়ায়—১০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত ছড়াতে পারে। যশোর ও রাজশাহী এলাকায় এর উপস্থিতি বেশি। 

এটি ফসলের খেত বা রাস্তার দুই ধারে জন্মাতে পারে। এটি সহজেই প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এই গাছ মূলত এসেছে মেক্সিকো থেকে। এখন পুরো উপমহাদেশেই ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, চীন, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে। 

এই আগাছাটিকে বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষিবিদদের মতে গাছটিকে এখন দেখলেই পুড়িয়ে ফেলা উচিত। এই ক্ষেত্রে এটি কাটতে গেলে শরীরে লেগে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এখান থেকে বিষক্রিয়া হতে পারে। তাই কাটার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

হাতে গ্লাভস ও চোখে চশমা পরে নিতে হবে। মোটা কাপড়ের বা জিনসের প্যান্ট পরা থাকতে হবে। বুটজুতা পরতে হবে। এরপর গাছ কেটে গভীর গর্ত করে তা পুঁতে ফেলতে হবে। আগাছানাশক ব্যবহার করেও এটিকে মারা যায়। এ ক্ষেত্রে ডায়ইউরোন, টারবাসিল, ব্রোমাসিলজাতীয় আগাছানাশক ৫০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি হেক্টরে ছিটিয়ে দিতে হবে। জৈবিকভাবেও এদের দমন করা যায়। পাতাখেকো পোকার মাধ্যমে এদের দমন করা সম্ভব। 

পার্থেনিয়াম গাছটিকে প্রথমে আমাদের চিনতে হবে। গাছ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং এর নিধনে কীভাবে আমরা ভূমিকা রাখতে পারি, তা পোস্টার, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির মাধ্যমে জানাতে হবে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

  পরিবেশ সেন্টমার্টিন রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৫ ১৬:১২ পিএম ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। এটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। কক্সবাজার শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে রয়েছে ১ হাজারের মতো ঘর। ধারণা করা হয়, ৩০০ বছর আগে থেকে এখানে মানুষ বসবাস করছে। বসবাসরত অধিকাংশ মানুষের পেশা মাছ ধরা। এরা কোরাল সংগ্রহও করে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী বসবাস করে। জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৬৬ প্রজাতির কোরাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক জাতীয় প্রাণী, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের তুলনায় এটি নানান কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এজন্য এর আলাদা বৈজ্ঞানিক মূল্যও অনেক বেশি। ২০২২ সালে সরকার এজন্য একে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। ২০...

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

হাতি সংরক্ষণ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ড. বিভূতিভূষণ মিত্র প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম ড. বিভূতিভূষণ মিত্র বাংলাদেশে বসবাসরত হাতির নাম এশিয়ান এলিফ্যান্ট। এ হাতি খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিশ্বের ১৩ দেশে এর বিচরণ। আইইউসিএনের মতে বাংলাদেশে তিন ধরনের হাতি রয়েছে। এগুলো হলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসরত হাতি, পরিব্রাজনকারী হাতি ও পোষ মানা হাতি। বন্য প্রাণীবিদদের মতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। একটি তথ্যমতে বাংলাদেশে আবাসস্থলে বসবাসরত হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিব্রাজনকারী হাতি ৯৩ আর পোষ মানা হাতি ৯৬টি। ২০১৯ সালের একটি তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল সে সময় ২৬৩টি। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জরিপমতে বাংলাদেশে বর্তমান হাতির সংখ্যা ২২৮ থেকে ৩২৭। মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে হাতি দেখা যায় বেশি। মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্বটা বেশি দেখা যায় সেখানেই। তবে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায়ও হাতি দেখা যায়। বন বিভাগের তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ১৭ বছরে ১১৮টি হাতি হত্যা করা হয়। আইইউসিএনের ২০২১ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশে গত ১৭ বছরে ৯০টি হাতি হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর শ্রীলঙ...

বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

 বন, বনভোজন ও পর্যটন শিল্প ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র  আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৯ এএম|প্রিন্ট সংস্করণ পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম পর্যটন শিল্প। এটি এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। কেননা একই সঙ্গে পৃথিবীতে যেমন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি এর ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নও সাধিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৫ মিলিয়ন, তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৬ লাখ ৬০ হাজারে। আর ২০১৭ সালেই জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ১০.৪ ভাগ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এমন অবদান দেখানো যাবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। পর্যটকদের সংখ্যাও অনেক ছিল। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। আর দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা যোগ করলে এর সংখ্যা প্রায় চার কোটির কাছাকাছি চলে যাবে। এর ফলে এ খাতে বিনিয়োগ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে অনেক। ২০১৭ সালের হিসাবমতে, পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২৪ লাখ ৩২ হাজার আর বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩...